image

ফিরলে জানিয়ো- পাঠ প্রতিক্রিয়া-মহুয়া বন্দ্যোপাধ্যায়

ফিরলে জানিয়ো বইটা পড়ে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। ভেতরে একদিকে গভীর কষ্ট, আবার তার সঙ্গেই ছিল একটুকরো আশা—হয়তো সত্যিই কোনো একদিন ওদের অসম্পূর্ণ গল্পটা পূর্ণতা পাবে। শেষের দিকটা পড়তে পড়তে অজান্তেই চোখ ভিজে গেল। বই শেষ হলেও তার রেশ এখনও মন থেকে মুছে যায়নি।

গল্পের নায়ক বিতান যেন হাজার হাজার মধ্যবিত্ত বাঙালি ছেলের প্রতিচ্ছবি। একদিকে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রেমিকা রোহিনীকে খুশি রাখার চেষ্টা—বাজেটের বাইরে গিয়ে দামি পোশাক কিনে দেওয়া, ছোট ছোট স্বপ্ন পূরণ করার ইচ্ছে; অন্যদিকে সংসারের দায়িত্ব, বাবার ধার-দেনা শোধ করার চিন্তা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। ভালোবাসা আর দায়িত্বের টানাপোড়েনে তার অন্তর্দ্বন্দ্ব, নিজের ইচ্ছাকে বারবার চাপা দেওয়া—এসব এতটাই বাস্তব যে মনে হয়েছে, এ তো আমাদের চারপাশেরই কোনো মানুষের গল্প।

image

বিতানের বড় মাছ নিয়ে অভিমান, তার বাবা-মায়ের সূক্ষ্ম প্রতিক্রিয়া, ছোট ছোট কথোপকথন, না-বলা অনুভূতি—এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলোই গল্পটাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, যেন সব দৃশ্য চোখের সামনেই ঘটছে। লেখকের লেখনী এতটাই জীবন্ত যে প্রতিটি চরিত্রকে অনুভব করা যায়।

বৈশালী চরিত্রটিও ভীষণ ভালো লেগেছে। শুরুতে সম্বন্ধ করে দেখতে এসে বিতানকে প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা, তারপর ধীরে ধীরে বিতানের নীরব কষ্ট, দায়িত্ববোধ আর ত্যাগকে উপলব্ধি করে তার প্রতি মন গড়ে ওঠা—এই পরিবর্তনটা একেবারেই স্বাভাবিক এবং বিশ্বাসযোগ্য লেগেছে। আর ঠিক যখন বিতান ও বৈশালীর সম্পর্ক একটা সুন্দর জায়গায় পৌঁছায়, তখনই ঘটে সেই দুর্ঘটনা। সেখান থেকেই শুরু হয় দায়িত্ব, ভালোবাসা, অপরাধবোধ, ভুল-ঠিক আর আত্মত্যাগের এক গভীর লড়াই, যা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে।

এই উপন্যাস শুধু প্রেমের গল্প নয়; এটি ভালোবাসা, স্বপ্ন, অপেক্ষা, ত্যাগ, দায়িত্ব, মধ্যবিত্ত জীবনের সংগ্রাম এবং মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের এক অসাধারণ দলিল। চরিত্রগুলোর বিশ্লেষণ এতটাই গভীর যে তারা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, পাঠকের মনের ভেতর বেঁচে থাকে।

গল্পটা হয়তো খুব সাধারণ, কিন্তু সেই সাধারণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসাধারণ আবেগ। বই শেষ হওয়ার পরও এখনও গল্পের আবেশ থেকে বেরোতে পারিনি। শেষের অংশটা পড়তে পড়তে অজান্তেই চোখ ভিজে গেল। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা আর একফোঁটা আশা রয়ে গেল—হয়তো কোনো একদিন সব অসম্পূর্ণতারও পূর্ণতা আসবে।

অভিষেক, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন একটি সুন্দর, বাস্তবধর্মী এবং হৃদয়ছোঁয়া উপন্যাস উপহার দেওয়ার জন্য। আমার একান্ত অনুরোধ, এই গল্পের দ্বিতীয় খণ্ড যেন অবশ্যই আসে। আমি সকল পাঠক-পাঠিকাকে এই বইটি পড়ার আন্তরিক অনুরোধ জানাব। আর যারা এখনও অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের Avishek Chattopadhyay II Avishek Chattopadhyay হৃদয় গহন পড়েননি, তাদেরও অবশ্যই হৃদয় গহন অনুরোধ করব। আমার বিশ্বাস, এই দুটি বইই আপনাদের অন্তরের গভীর অনুভূতিগুলোকে স্পর্শ করবে।

Scroll to Top